Monday, December 25, 2017

Blog Administrator

রুম কে? আমেরিকা না রাশিয়া, অর্থোডক্স না ক্যাথোলিক - ঐতিহাসিক ও ধর্মতাত্ত্বিক পর্যালোচনা (২য় অনুচ্ছেদ)


দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ
ঈসা (আঃ) এর প্রসিদ্ধ সাহাবী বার্নাবাসের চিন্তা ধারা হল, ঈসা মাসিহা আঃ কে শুলে চড়ানো হয় নি তাকে আল্লাহ উঠিয়ে নিয়েছিলেন এবং ঈসা (আঃ), রাসুল (সা)-এর আগমনের সুসংবাদ দিয়েছিলেন- শিস্যগণ বললেন, ওগো মুর্শিদ! সেই মানুষ কে হবেন যার সম্পর্কে বলেছেন আপনি, কে তিনি, যিনি জগতে আসবেন? ঈসা হৃদয়ের পূর্ণ আনন্দ নিয়ে জবাব দিলেন, তিনি মুহাম্মদ, আল্লাহর রাসূল (বার্নাবাস ১৬৩:৭-৮)

গ্রেট কুস্তান্তিনের সময়েই পোপ, বার্নাবাসের চিন্তা ধারাকে পড়া ও প্রচার করা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল ও তার পুথি লুকিয়ে রেখে ছিল যা ১৭০৯ সালে উদ্ধার করা হয়। এই থেকে আমরা বুঝতে পারি যে সঠিক ঈসা (আঃ)-এর ধর্মকে একদম শেষ না করতে পারলেও পুরো ভেজাল করে দেয়া হয়েছিল। যাইহোক ৩২৫ খ্রিস্থাব্দে যখন আরিউসের মতবাদকে খারিজ করে দেয়া হয় তখন মূলত ঈসা আঃ এর মূল শিক্ষাকে বাতিল করে দেয়া হয়েছিল।

আরিউস জোর দাবি করত, আল্লাহই নিত্য ও নিরন্তন সত্তা। তার সমকক্ষ নয় কেউ। তিনিই পুত্র কে সৃষ্টি করেছেন। (From Christ to Constantine- Mackinon) পরে আরিউসকে নির্বাসিত করা হয়। এর অনেক পরে ভেজাল পৌলবাদের সাথে মিশিয়ে আরিউসের চিন্তা ধারাকে একটু করে মিলিয়ে কিবতি ও নাসতুরি মতবাদের উথান হয়। মোটকথা ক্যাথলিকরা তো পুরো বিভ্রান্ত ছিল তবে ঈসা (আঃ) এর শিক্ষা তখন একটু আদুটু অর্থডোক্সদের মধ্যে ছিল। তাই তাদের কেউ কেউ এক রাসুল আসার অপেক্ষায় থাকতো সাথে নির্ভেজাল আকিদা খুঁজতো। 

এভাবেই আমরা যখন দেখি আবিসিনিয়ার বাদশাহ ছিলেন নাজ্জাসী সে ছিলেন খ্রিস্টান নাসতুরি মতবাদের অনুসারী। মুসলিমরা প্রথম হিজরত করেন আবিসিনায়। তখন কুরায়শ প্রতিনিধি আমর বিন আস (রা) এর আবেদনে আবিসিনায়ার বাদশাহ নাজ্জাসী ঈসা (আঃ) সম্পর্কে মুসলিমদের বিশ্বাস কি তা জানতে চান। তখন জাফর ইবনে আবু তালিব (রা) বলেন- “ঈসা (আঃ) হচ্ছেন আল্লাহর বান্দা ও রাসূল....আল্লাহর হুকুম এবং বিশেষ ব্যবস্থাধীনে কুমারী মারয়ামের গর্ভে ঈসা (আঃ) এর জন্ম হয়” এই কথা শুনে নাজ্জাসী তার হাতে থাকা একটা খড় উচু করে বললেন-“আল্লাহর কসম যা তোমরা বলছ ঈসা (আঃ) তার চেয়ে এই খড়ের টুকরা পরিমাণও বেশি কিছু ছিলেন না।” (আর রাহিকুল মাখতুম)

৭ হিজরিতে রাসূল (সা) যখন নাজ্জাসীকে পত্র লিখে দাওয়াত দেন তখন নাজ্জাসি ঈমান আনে ও ফিরতি পত্রে রাসূল (সা) কে লিখেন “আল্লাহর শপথ, আপনি ঈসা (আঃ) সম্পর্কে যা কিছু লিখেছেন আমি তাকে এর চাইতে একটুও বেশি মনে করি না” আর অন্য দিকে মিশরের রাজা মূককাসকে রাসূল (সা) দাওয়াতি চিঠিতে কিবতিদের প্রধান বলে অভিহিত করে। আর পরে মূককাস জবাবী পত্রে লেখে কিবতী মতবাদি হওয়ায় সেও বিশ্বাস করে যে এক নতুন নবীর আগমন সন্নিকটে।

পবিত্র কুরআন ও হাদিসে সকল প্রকার খ্রিষ্টানের কথা বলা হয়েছে। কখনো বলা হয়েছে এমন ঈসায়ী যাদের মধ্যে দরবেশ, আলেম ও আধ্যাত্মিক নেতা আছে আবার কখনো বলা হয়েছে তারা ঈসাকে আল্লাহ পুত্র বলে ও ট্রিনিটি তে বিশ্বাস করে।

রুম ও ইসলাম  

এই রুম শব্দে পবিত্র কুরআনে কারিমায় একটা আলাদা সূরা আছে আর-রুম।

আল্লাহ বলছেন, আলিফ লাম মিম, রোমকরা পরাজিত হয়েছে। নিকটবর্তী এলাকায় এবং তারা তাদের পরাজয়ের পর অতিসত্বর বিজয়ী হবে। কয়েক বছরের মধ্যে। অগ্র-পশ্চাতের কাজ আল্লাহর হাতেই। সেদিন মুমিনগণ আনন্দিত হবে। (সুরা আর-রুম:১-৪)

পারস্য ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ চলছিল। এতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সাংঘাতিক ভাবে পরাজিত হয় এমনকি পারস্যরা বসফরাস পর্যন্ত চলে যায় ও কুস্নতুন্তুনিয়া অবরোধ করে। শহরের মজুবত প্রাচীর ও শক্তিশালী নেভির কারনে কোন মতন হেরাকল তার সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখে। তাই কুরআন বলা হয়েছে যে রোমকরা পরাজিত হয়েছে (এখানে রোমকরা বলতে নিঃসন্দেহে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে বুঝাচ্ছে) এর পরে ৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে হেরাকল আবার সৈন্য সংগ্রহ করে পরাজিত এলাকা (সম্পূর্ণ শাম ও ফিলিস্তিন) ছিনিয়ে নেই। এই বিজয়েরই আগাম খবর আল্লাহ দিয়েছেন, যে কয়েক বছরের মধ্যে রোমানরা বিজয় লাভ করবে এবং সেদিন মু’মিনদের আনন্দিত হতেও বলেছেন। 

এমনই ভাবে আমরা দেখি রাসূল (সা) যখন বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজা হেরাকল কে দাওয়াতি পত্রে সম্বোধন করেছেন ‘আজিমে রুম’ অর্থাৎ রুম রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি-

“আমি সেই আল্লাহর নামে এই পত্র আরম্ভ করতেছি যিনি অতিশয় দয়ালু ও করুণাময়। এই পত্র আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল মুহাম্মদ (সা) এর পক্ষ হতে রোমের প্রধান হিরাকলের নামে প্রেরণ করা হচ্ছে...”

স্পষ্ট ভাবে বুঝা যাচ্ছে যে এইখানে রুম বলতে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে বুঝানো হচ্ছে রোমান সাম্রাজ্যকে নয়। যাইহোক পত্র পেয়ে কায়সারে রুম (হেরাকল) ঈমান আনতে চাচ্ছিলেন তাই একসময় ঘোষণাও করে দেন কিন্তু পরে আমীর ও পাদ্রীদের বিরূপ মনোভাব ও রাজ্যের লোভের কারনে ঈমান আনেননি।

ক্রুসেড ও ফাইনাল ক্রুসেড মালহামা 

৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমরা জেরুজালেম দখল করে নেয়। বাইজেন্টাইন তথা খ্রিস্টানরা আবার এটা উদ্ধারের তেমন কোন পদক্ষেপ নেয় না। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন মুসলিমদের উথান শ্লথ হয়ে যায় তখন আবারো খ্রিস্টানরা পবিত্র ভুমি উদ্ধারে প্রতিজ্ঞা করে। তবে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য বা অর্থডোক্সরা তেমন উৎফুল্ল ছিল না যতটা ক্যাথলিকরা ছিল। মুসলিমদের সাথে বার বার বাইজেন্টাইনের সংঘাত হয় তবে সেই যুদ্ধ কে কখনো অর্থডোক্সরা কোন ধর্মীয় যুদ্ধ নাম দেই নি। ১০৮০ দশকে সবাই কে অবাক করে রোমান ক্যাথোলিক পোপ দ্বিতীয় আরবান ক্রুসেড ঘোষণা করে বলে-“যে ব্যক্তিই এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে তার পাপমোচন অবধারিত। যারা এই যুদ্ধে মারা যাবে তারা সোজা জান্নাতে চলে যাবে” এইভাবে ক্যাথোলিকরা পশ্চিম ইউরোপ থেকে কুস্তুন্তুনিয়া পেরিয়ে এসে সেলজুকি ও আউউবি সুলতানদের সাথে এক ধর্ম যুদ্ধ (ক্রুসেড) করে। ১০৯৬-১২৯১ পর্যন্ত প্রায় ৯টি ক্রুসেড হয়।

অবাক করে যে, নওখ্রিস্টানরাই মানে পশ্চিম ইউরোপের ক্যাথোলিকরাই এতে বেশি অংশগ্রহন করে। এদের মধ্যে তাদেরকেই বেশি দেখা যায় যারা একসময় খাযারিয়া সাম্রাজ্যে বসবাস করত এবং তাদেরকেও যারা ৭ম শতাব্দীর শুরুতে ককেসিয়ার ডারিয়াল গর্জ গিরিপথের সম্মুখের প্রাচীর ভাঙ্গার পর বের হয়ে রোমান ক্যাথোলিক ধর্ম গ্রহন করে (ইয়াজুজ মাজুজ নিয়ে আলোচনায় ইনশাআল্লাহ্‌ এই নিয়ে লিখব)।




ক্রুসেড আর্মির রুটঃ 
পশ্চিম ইউরোপ থেকে এই বিভিন্ন পথে তারা মধ্যপ্রাচ্যে ও কন্সটান্টিনোপলে আসত
অধিকাংশ ক্রুসেডাররা ফরাসীদের মত হওয়ায় মুসলমানরা তাদেরকে ফ্রাঙ্ক (Franji) হিসবে আখ্যায়িত করতো। পোপ তখন ফ্রান্সে বাস করত তাই সেখান থেকেই বেশি সৈন্য নেয়া হত এছাড়াও যারা যোগদান করেছিল তারা হলো ইংরেজ, স্কটিশ, নরম্যান, বেলজীয়, ওলন্দাজ, স্ক্যান্ডেনেভীয় ও সুইসরা। যুদ্ধে অর্থডোক্সরা (কনস্টান্টিনোপল ও পূর্ব ইউরোপের  জনগণ) তেমন অংশগ্রহন করতো না অথচ তাদের ভুমি থেকেই যুদ্ধ পরিচালিত হত। 





৪র্থ ক্রুসেড -
 ১২০৪ সালে ক্রুসেড সৈন্যরা বাইজেন্টইনের
 রাজধানী কন্সটান্টটিনোপোলআক্রুমন করছে
আরো অবাক করা বিষয় হলো যা আমার অনেক মুসলিমই জানি না, যে ক্রুসেড শুধু মুসলমানদের বিরুদ্ধে হয়নি এটা অর্থডোক্সদের বিরুদ্ধেও হয়েছে। ১২০৪ সালে ক্রুসেডারা বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল অবরোধ করে অর্থডোক্সদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে পুরো অর্থডোক্স নগরীকে বিধ্বস্ত করে দেয় এটাই চতুর্থ ক্রুসেড নামে পরিচিত। এই ধ্বংসাযজ্ঞয়ের পরে অনেক অর্থডোক্সরা বাধ্য হয়ে পূর্ব ইউরোপে চলে যায়। আর ফল স্বরূপ ক্যাথোলিক চার্চ ও অর্থডোক্স চার্চের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ প্রকট হয়ে উঠে।








অর্থোডক্সরা তথা বাইজেন্টাইনীয়রা পশ্চিম ইউরোপের খ্রিস্টানদের ল্যাটিন হিসাবে আখ্যায়িত করত। আর এই ধনাঢ্য ও শিক্ষিত বাইজেন্টাইনীয়রা ল্যাটিনদেরকে উচ্ছৃঙ্খল, অধার্মিক, লোভী, রক্তপিপাসু ও অপবিত্র হিসাবে জ্ঞান করত। চতুর্থ ক্রুসেডের সময় ৮৭৪ বছরের প্রাচীন শহর কনস্টান্টিনোপল ছিল সম্পদ ও প্রাচুর্যে ভরপুর। তিনটি প্রাচীর ঘেরা নগরীর লোক সংখ্যা ছিল প্রায় ১০ লাখ।  ক্রুসেডাররা পুরো শহর কে ধ্বংস করে দেয় ও লুটপাত চালায়।

এর পরের সকল ক্রুসেড আবার মুসলিম দের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় আর ৯ম ক্রুসেডে ক্রুসেডাররা মঙ্গোলদের সাথে জোট করে মুসলিম মামলুক রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

(ইনশাআল্লাহ্‌ সামনের পোষ্টগুলোতে প্রমান হয়ে যাবে যে কিভাবে এই পশ্চিমা ইউরোপীয়রা তাদের শেষ ক্রুসেড করেছিল ১৯১৭ সালে অর্থডোক্সদের কেন্দ্র রাশিয়াকে পরাজিত করে নাস্তিকতা ঢুকিয়ে, এবং ১৯২৪ সালে মুসলমানদের কেন্দ্র উসমানী খেলাফত, তুর্কীকে ধ্বংস করে ধর্ম নিরেপেক্ষতা ঢুকিয়ে। সর্বশেষে চূড়ান্ত ক্রুসেড মালহামা এই ক্যাথোলিকরা তথা পিছনের শত্রুরা আবারো অর্থডোক্স ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে পরিচালিত করতে যাচ্ছে।)

কনস্টান্টিনোপল 

বাইজেন্টাইন কিং অষ্টম মাইকেল পেলাইলগস ১২৬১ সালে কনস্টান্টিনোপল পুনরায় দখল করেন তখন সেখানে মাত্র ৩৫ হাজার অর্থডোক্স জনগণ বসবাস করছিল যেখানে ১২০৪ সালে ছিল ১০ লক্ষ। এরপরে মুসলমানরা ১৪৫৩ সালে সুলতান মাহমুদ ফাতেহ কর্তৃক কনস্টান্টিনোপল দখল করে। তখন সেখানে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ছিল তারপর তারাও পূর্ব-ইউরোপে পাড়ি জমায়। তবে তাদের মনে এক দুঃখ সব সময় থাকে সেটা হল তাদের প্রধান হাজার বছরের চার্চ ‘হাগিয়া সোফিয়া’ কে ছেঁড়ে যাওয়া, তাই এখনও তুরস্কের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পর্যটন আসে রাশিয়া থেকে। তারা এখনও মনে করে একদিন তারা আবার এই চার্চ ফিরে পাবে।

নাইট টেম্পলার 



নাইট টেম্পলার- ক্রস নিয়ে লড়াই কারীরাই
 ক্রুশের জয় হয়েছে বলে দাবী করবে
নাইট টেম্পলার- ক্রস নিয়ে লড়াই কারীরাই ক্রুশের জয় হয়েছে বলে দাবী করবে
১১১৯ সালে রোমান ক্যাথোলিক চার্চ নাইট টেম্পলার গঠিত করে স্বীকৃতি দেই। এদের কাজ হল সলোমন টেম্পল কে রক্ষা করা। এটা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী আর্মি সংস্থা ছিল। এরা এমন কিছু আবিষ্কার করে যে পরে ক্যাথোলিক চার্চই ১৩১২ সালে এদের বিলুপ্তি ঘোষণা করে। কথিত আছে যে এরা এমন কিছু প্রাচীন ডকুমেন্ট পেয়েছিল যা ক্যাথোলিক তথা পৌলবাদ কে সম্পূর্ণ ভাবে ভ্রান্তি ও বাতিল করে দিত।


লিখেছেনঃ Kaisar Ahmed


ট্যাগ
রোমান, রোমক, বাইজেন্টাইন, অর্থোডক্স, রোমান ক্যাথোলিক, সূরা রুম, রোমান এম্পায়ার, ত্রিত্ববাদ, ক্রুসেড, আখেরী জামানা, ইহুদি, মালহামা, ঈসা, কনস্টান্টিনোপল, নাজ্জাসী